05 November, 2026
•
১ মিনিট পাঠ
•
২০ বার পঠিত
দাড়ি রাখার বিধান।
প্রশ্নকারীর প্রশ্ন ও প্রেক্ষাপট:
বিজয়নগর ,বি-বাড়িয়া
"কারী মুহম্মদ হাসানুজ্জামান (বি-বাড়িয়া)
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
দাড়ি রাখার হুকুম কি??"
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
দাড়ি রাখার হুকুম কি??"
বিস্তারিত আলোচনা ও শরয়ী তাহকীক:
পুরুষদের জন্য দাড়ি রাখা ফরজ (فرض)। কমপক্ষে এক মুষ্টি (এক মুষ্টি/قبضة) পরিমাণ দাড়ি রাখা আবশ্যক। এক মুষ্টি পূর্ণ হওয়ার আগে দাড়ি কাটা বা ছোট করা হারাম (حرام) এবং কবীরা গুনাহ (কবীরা গুনাহ) হিসেবে গণ্য। দাড়ি কাটাকে বৈধ মনে করা কুফরি (কুফরি)।
পবিত্র হাদীছ শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ উনার আলোকে
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মোঁচ কাটার ও পবিত্র দাড়ি মুবারক লম্বা করার আদেশ মুবারক করেছেন।’
إنه أمر بإحفاء الشوارب وإعفاء اللحية
"নিশ্চয়ই তিনি মোচ উত্তমরূপে কাটার এবং পবিত্র দাড়ি মুবারক লম্বা করার আদেশ দিয়েছেন।"
— সহীহ মুসলিম শরীফ ১/১২৯
হাদীস শরীফে ব্যবহৃত শব্দসমূহ
বিভিন্ন হাদীস শরীফে উনার আদেশ মোবারকের শব্দগুলোও বর্ণিত হয়েছে। যেমন
প্রথম হাদীস শরীফ :
خالفوا المشركين، وفروا اللحى واحفوا الشوارب
"মুশরিকদের বিরোধিতা কর। দাড়ি বাড়াও ও মোচ কাট।"
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার সূত্রে, বুখারী ২/৮৭৫
দ্বিতীয় হাদীস শরীফ :
خالفوا المشركين، واحفوا الشوارب وأوفوا اللحى
"মুশরিকদের বিরোধিতা কর এবং মোচ কাট ও দাড়ি পূর্ণ কর।"
— ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার সূত্রে, মুসলিম ১/১২৯
তৃতীয় হাদীস শরীফ :
انهكوا الشوارب واعفوا اللحى
"মোচ উত্তমরূপে কাট এবং দাড়ি লম্বা কর।"
— ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার সূত্রে, বুখারী ২/৮৭৫
চতুর্থ হাদীস শরীফ :
جزوا الشوارب وارخوا اللحى، خالفوا المجوس
"মোচ কাট ও দাড়ি ঝুলিয়ে দাও, অগ্নিপূজারীদের বিরোধিতা কর।"
— আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার সূত্রে, মুসলিম ১/১২৯
শব্দ বিশ্লেষণ
উপরের হাদীস শরীফ উনাগুলোতে চারটি শব্দ পাওয়া গেল :
আরবি শব্দ বাংলা অর্থ
اَرْخُوا ঝুলিয়ে দাও / লম্বা কর
اَعْفُوا লম্বা কর / ছেড়ে দাও
اَوْفُوا পূর্ণ কর
وَفِّرُوا বাড়াও / প্রচুর কর
এই সবগুলো শব্দ থেকে বোঝা যায়, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার লম্বা ও পূর্ণ দাড়ি মুবারক রাখার আদেশ মুবারক করেছেন। সুতরাং এভাবেই দাড়ি রাখা ফরজ। একমুষ্ঠি হওয়ার পূর্বে দাড়ি কাটা বা ছাঁটা হারাম। চার মাযহাবের ইমামগণ উনারা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার দলিল : দাড়ি রাখা ফরয সাব্যস্ত হওয়ার সর্বোচ্চ দলিল
মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন শরীফে নবী হযরত হারুন আলাইহিস সালাম উনার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ মুবারক করেন -
قَالَ يَا ابْنَ أُمَّ لَا تَأْخُذْ بِلِحْيَتِي وَلَا بِرَأْسِي إِنِّي خَشِيتُ أَن تَقُولَ فَرَّقْتَ بَيْنَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَمْ تَرْقُبْ قَوْلِي
"হযরত হারুন আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, হে আমার সহোদর! আমার দাড়ি ও মাথার চুল ধরো না। আমি আশঙ্কা করছি, আপনি বলবেন—আপনি বনী ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং আমার কথার প্রতি লক্ষ্য করনি।"
— সূরা ত্বহা : ৯৪
এই আয়াত শরীফ থেকে ফরয সাব্যস্ত হওয়ার দলিল
আল্লামা শানকীতী রহমতুল্লাহি. উনার তাফসীর 'আদওয়াউল বায়ান'-এ এই আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় বলেন
"এই আয়াত শরীফ দাড়ি রাখার আবশ্যকতা (لزوم إعفاء اللحية) প্রমাণ করে। এটি দাড়ি রাখা ও মুণ্ডন না করার একটি কুরআনী দলিল। যখন আপনি জানলে যে, হযরত হারুন আলাইহিস সালাম উনার দাড়ি পূর্ণ ছিল—যার দলিল হলো তিনি উনার ভাইকে বললেন 'আমার দাড়ি ধরো না'। কারণ তিনি যদি মুণ্ডিত মস্তক হতেন, তবে উনার ভাই উনার দাড়ি ধরতে চাইতেন না। তখন তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, দাড়ি রাখা সেই সীমার অন্তর্ভুক্ত যা পবিত্র কুরআন শরীফ আমাদেরকে আদেশ করেছে এবং তা সকল সম্মানিত রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম উনাদের রীতি ছিল।"
— আদওয়াউল বায়ান ৪/৫০৬-৫০৭
এই আয়াত শরীফের দলিলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দাড়ি রাখার বিধানকে শুধু হাদীস শরীফের উপর নির্ভরশীল না রেখে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে। আর পবিত্র কুরআন শরীফ উনার দলিল দ্বারা যে বিধান সাব্যস্ত হয়, তা ফরয হিসেবে সাব্যস্ত হয়। তাই দাড়ি রাখা ফরয।
দাড়ির বিধান : মৌলিক ও সাধারণ
এখানে কয়েকটি বিষয় জেনে রাখা দরকার :
১. দাড়ির বিধান শরীয়ত উনার মৌলিক বিধান
দাড়ির বিধানটি শরীয়ত উনার একটি মৌলিক ও সাধারণ বিধান। একে নিছক আরবীয় রীতি বা বিশেষ স্থান-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা মারাত্মক ভ্রান্তি। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফ উনার বাণী সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।
ফিতরাত উনার দশটি বিষয়
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন—
عشر من الفطرة : قص الشارب، وإعفاء اللحية، والسواك، واستنشاق الماء، وقص الأظفار، وغسل البراجم، ونتف الإبط، وحلق العانة، وانتقاص الماء
"দশটি বিষয় 'ফিতরাত'-এর অন্তর্ভুক্ত : মোচ কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, চামড়ার ভাঁজের জায়গাগুলো ধৌত করা, বগলের নীচের চুল তুলে ফেলা, নাভীর নীচের চুল মুন্ডানো, (বাথরুমের প্রয়োজন পূরণের পর) পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা।"
— সহীহ মুসলিম শরীফ
বর্ণনাকারী বলেন, দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি, যদি না তা হয় 'কুলি করা'।
ফিতরাত শব্দের অর্থ
আরবীতে 'ফিতরাত' শব্দের অর্থ স্বভাব। আল্লাহ পাক রাববুল আলামীন যে উত্তম মানবীয় স্বভাব সৃষ্টি করেছেন তার সর্বোত্তম নিদর্শন নবী ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম। এ কারণে 'ফিতরাত' শব্দটির অর্থ করা হয়েছে আদর্শ ও অনুকরণীয় স্বভাব, তথা নবী ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম উনাদের স্বভাব।
তো হাদীস শরীফ থেকে বোঝা যাচ্ছে, মোচ কাটা ও দাড়ি রাখাই হচ্ছে পুরুষের স্বাভাবিক অবস্থা এবং সকল নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সুন্নাহ ও আদর্শ, যাঁদের অনুসরণের আদেশ পবিত্র কুরআন শরীফে করা হয়েছে।
এই হাদীস শরীফ থেকে আরো বোঝা যায়, দাড়ি মুন্ডানো হচ্ছে একটি বিকৃতি, কিন্তু ব্যাপক বিস্তারের কারণে অন্য অনেক বিকৃতির মতো এটাও এখন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে; বরং পুরুষের শ্মশ্রুমন্ডিত স্বাভাবিক রূপটিই এখন দ্বিধা ও সংকোচের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পবিত্র কুরআন শরীফে শয়তানের প্রতিশ্রুতি
এই বিকৃতির সূত্রও আমরা পবিত্র কুরআন শরীফে পাই। পবিত্র কুরআন শরীফে মহান আল্লাহ পাক তাআলা শিরকের বিষয়ে কঠিনভাবে সাবধান করেছেন এবং শিরকে লিপ্ত লোকদের সম্পর্কে বলেছেন যে, এরা আসলে শয়তানের (অনুগত ও শয়তানের) কাছে প্রার্থনা করে। এরপর শয়তান যে মানবজাতির চরম শত্রু সে বিষয়ে বান্দাদেরকে সাবধান করেছেন। এ প্রসঙ্গে শয়তানের একটা উদ্ধত ঘোষণাও আল্লাহ পাক তাআলা বান্দাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক তাআলা বলেন-
وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا
"আর সে (মহান আল্লাহ পাক কে) বলেছিল, আমি আপনার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্ধারিত এক অংশকে নিয়ে নেব। এবং আমি তাদেরকে সরল পথ হতে নিশ্চিতভাবে বিচ্যুত করব, তাদেরকে অনেক আশা-ভরসা দেব, এবং তাদেরকে আদেশ করব, ফলে তারা চতুষ্পদ জন্তুর কান চিরে ফেলবে। এবং তাদেরকে আদেশ করব, ফলে তারা মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্টিকে বিকৃত করবে। যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার পরিবর্তে শয়তানকে বন্ধু বানায়, সে সুস্পষ্ট লোকসানের মধ্যে পড়ে যায়।"
— সূরা নিসা : ১১৮-১১৯
দাড়ির বিধান মৌলিক : হাদীস শরীফ উনার দলিল
২. আল্লাহ পাক উনার আদেশ ও দ্বীন উনার অংশ
দাড়ির বিধান যে একটি মৌলিক বিধান তা ঐসব হাদীস শরীফ থেকেও বোঝা যায়, যেখানে সরাসরি একে আল্লাহ পাক উনার আদেশ বা দ্বীন উনার অংশ বলা হয়েছে।
বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবা রহমতুল্লাহ আলাইহি তিনি বলেন—
جاء رجل من المجوس إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم قد حلق اللحية وأطال شاربه فقال له النبي صلى الله عليه وسلم ما هذا؟ قال : هذا في ديننا، قال : لكن في ديننا أن نجز الشارب وأن نعفي اللحية
"জনৈক অগ্নিপূজক নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এসেছিল। তার দাড়ি মুন্ডানো ছিল ও মোচ লম্বা ছিল। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এটা কী?' সে বলল, 'এটা আমাদের ধর্মের নিয়ম।' নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'কিন্তু আমাদের দ্বীন উনার বিধান, আমরা মোচ কাটব ও দাড়ি লম্বা রাখব।'"
— মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১৩/১১৬-১১৭, হাদীস শরীফ: ২৬০১৩
ইতিহাস উনার কিতাবে বিস্তারিত বর্ণনা
উল্লেখ্য, পারস্য সম্রাটের উদ্দেশে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পত্র পাঠিয়েছিলেন। এ ঘটনা সহীহ বুখারীতে আছে। ইমাম উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ রাহমাতুল্লাহ আলাইহি উনার সূত্রেই তা বর্ণিত হয়েছে। তবে সেখানে তা আছে সংক্ষেপে।
এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে আছে ইতিহাস উনার কিতাবে। ইমাম ইবনে জারীর তবারী রহমতুল্লাহ আলাইহি যায়েদ ইবনে আবী হাবীব রাহমাতুল্লাহ আলাইহি উনার সূত্রে তা বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে—
"ইয়েমেনের শাসকের পক্ষ থেকে দু'জন লোক নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এল। তাদের দাড়ি মুন্ডানো ছিল এবং মোচ লম্বা ছিল। তাদের চেহারার দিকে তাকাতেও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কষ্ট হচ্ছিল। তিনি তাদেরকে বললেন, 'তোমাদের মরণ হোক! এ কাজ করতে কে তোমাদেরকে বলেছে?' তারা বলল, 'আমাদের প্রভু (কিসরা) আমাদেরকে আদেশ করেছেন।' নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'কিন্তু আমার রব আমাকে আদেশ করেছেন, দাড়ি লম্বা রাখার ও মোচ খাটো করার।'"
— ولكن ربي أمرني بإعفاء لحيتي وقص شاربي
— আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৪৫৯-৪৬০
মুশরিকদের বিরোধিতা ও মুসলিম পরিচয়
৩. মুসলমান উনার পরিচয়-চিহ্ন
কোনো কোনো হাদীস শরীফে দাড়ি লম্বা রাখার আদেশের সাথে মুশরিকদের বিরোধিতার কথাও বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, দাড়ি যেমন শরীয়ত উনার একটি বিধান তেমনি তা মুসলমান উনার পরিচয়-চিহ্ন, যার দ্বারা মুমিন-মুসলমানকে প্রথম দৃষ্টিতেই আলাদা করে চেনা যাবে। এটি মুসলমান উনার জাতীয় চেতনাবাহী একটি বিষয়।
অমুসলিমদের সাথে স্বাতন্ত্র রক্ষা ইসলাম উনার একটি মৌলিক বিধান। বেশ-ভূষা, পর্ব-উৎসব, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি—এককথায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুসলিম-স্বাতন্ত্র রক্ষা করা অপরিহার্য। আর তা হবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শের অনুসরণ ও অনৈসলামিক রীতি-নীতি পরিহারের মাধ্যমে। এ কারণে উপরোক্ত হাদীস শরীফ উনাগুলোতে মুশরিক-মাজূস ও ইয়াহুদ-নাসারার বিরোধিতার যে আদেশ করা হয়েছে তা দাড়ির বিধানটিকে আরো তাকীদ করেছে এবং ভিন্ন মাত্রা দান করেছে।
বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব
বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব অনেক বেশি এবং ছওয়াব ও ফযীলতও ইনশাআল্লাহ অনেক বেশি। কারণ অমুসলিমদের বিকৃতি এখন মুসলমানদের মাঝেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক ভালো মানুষও শুধু সমাজের অনুকরণ করতে গিয়ে এই বিকৃতিকে গ্রহণ করেছে। এটা নিঃসন্দেহে 'ফাসাদুল উম্মাহ' বা উম্মত উনার অধঃপতন ও আদর্শত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত।
সুতরাং এ সময় দাড়ি রাখা অর্থ উম্মত উনার আদর্শত্যাগের সময় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাহ ও আদর্শ উনার একটি অংশের উপর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। এভাবে এই সময়ে যারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শকে ধারণ করবেন এবং উনার পূর্ণ অনুসারী হবেন ইনশাআল্লাহ তারা শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
من تمسك بسنتي عند فساد أمتي فله أجر شهيد
"আমার উম্মত উনার ফাসাদ (আদর্শত্যাগের) সময় যে আমার সুন্নাহ (আদর্শ)কে ধারণ করবে সে শহীদের মর্তবা লাভ করবে।"
এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কাটার বিধান
৪. এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ
এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কাটার সুযোগ শরীয়তে রয়েছে। হাদীস শরীফ উনার কিতাবে পাওয়া যায়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কেটেছেন।
আবু যুরআ রাহমাতুল্লাহ আলাইহি তিনি বলেন—
"আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার দাড়ি মুঠ করে ধরতেন। এরপর এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন।"
— মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১৩/১১২, হাদীস : ২৫৯৯২; ২৫৯৯৯
হযরত নাফে রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন—
"আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাড়ি কেটে ফেলতেন।"
— প্রাগুক্ত হাদীস শরীফ : ২৫৯৯৭
হযরত হাসান বসরী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি তিনি বলেন—
"উনারা(সাহাবা-তাবেয়ীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাড়ি কাটার অবকাশ দিতেন।"
— মুসলিম শরীফ ১৩/১১২, হাদীস শরীফ : ২৫৯৯৫
কিন্তু কোনো সহীহ বর্ণনায় এক মুষ্ঠির ভিতরে দাড়ি কাটার কোনো অবকাশ পাওয়া যায় না।
সাহাবা-তাবেয়ীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের এই আমলকে পূর্বোক্ত মারফূ হাদীস শরীফ উনাগুলোর ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা যায়। সুতরাং এ বিষয়ের হাদীস শরীফ ও আছার থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দাড়ি লম্বা রাখা ওয়াজিব, কেটে বা ছেটে এক মুষ্ঠির চেয়ে কম রাখার অবকাশ শরীয়ত উনারে নেই।
কোনো কোনো বন্ধুকে দেখা যায়, হজ্ব থেকে ফিরে দাড়ি রাখেন, কিন্তু এক মুষ্ঠির কম কিংবা তার চেয়েও ছোট ছোট। এর দ্বারা দাড়ি রাখার বিধান পালন হয় না। আল্লাহ পাক তাআলা উনার অনুগ্রহে যখন দাড়ি রাখার প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছে তখন এমনভাবেই রাখা উচিত, যা উনার নিকটে মকবুল হবে। অন্যথায় বিষয়টি এই দাঁড়াবে যে, এতদিন শয়তান একভাবে বিভ্রান্ত করেছিল এখন অন্যভাবে বিভ্রান্ত করল।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দাড়ি মুবারক
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চেহারা মুবারক ছিল ঘন শ্মশ্রুমন্ডিত। উনার দাড়ি মুবারক ছিল বুকের এক পার্শ্ব থেকে অন্য পার্শ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। কিছু হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে
كان النبي صلى الله عليه وسلم كث اللحية
"নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘন দাড়ি বিশিষ্ট ছিলেন।"
— তিরমিযী শরীফ (শামায়িল), আহমদ (মুসনাদ); শায়খ আহমদ শাকের বলেছেন, এর সনদ সহীহ
وفي رواية : كان عظيم اللحية
"অন্য বর্ণনায় আছে : তিনি বিশাল দাড়ি বিশিষ্ট ছিলেন।"
— আহমদ (মুসনাদ); শায়খ আহমদ শাকের বলেছেন, এর সনদ সহীহ
সুতরাং দেশী বা বিদেশী কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণীর অনুকরণের পরিবর্তে আমাদের কর্তব্য নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুকরণ করা। কারণ আমরা তো উনারই উম্মত।
একটি অনুভূতির কথা
সবশেষে একটি অনুভূতির কথা বলি। কিছুদিন আগে আমাদের মসজিদ উনার একজন মুসল্লী ইন্তেকাল করলেন। ইন্তেকালের আগে তিনি কিডনির রোগে বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। আমরা কয়েকজন তাকে দেখতে গেলাম। প্রথম দর্শনেই একটি স্নিগ্ধ অনুভূতি আমাদেরকে আচ্ছন্ন করল। তাঁকে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। গোটা দেহ সাদা চাদরে ঢাকা। শুধু মুখটি খোলা ছিল। সফেদ দাড়ি শোভিত তাঁর প্রশান্ত মুখটি দেখে আমার মনে হয়েছিল তিনি এক শান্তিময় জীবনের দিকে যাত্রা করেছেন! (আল্লাহ পাক তাআলা কবুল করুন।)